নির্বাচনের আগের দিন

সকালের শান্তির ঘুমটা ভাঙ্গতেই চায় না। তবুও উঠতেই হবে। দায়িত্বের কাছে, সে যে বন্ধি। আগামী কাল নির্বাচন, আজ থেকেই তার প্রভাব পড়বে পুরো শহর জুড়ে। এই সব সাত-পাঁচ ভেবে ঘুম থেকে উঠলো রাহুল। যদিও এই সব তার গতকাল রাতে ভাবা উচিত ছিল। তাহলে আজ একটু আগে ঘুম থেকে উঠা যেত। নিজের উপরই এখন রেগে যাচ্ছে সে। রাগ করে কি আর হবে। যা চলে গেছে তা তো আর ফিরে আসবে না। আজ অন্য আর পাঁচটা দিনের মতো আলসেমী করে সকালের কাজ শেষ করা যাবে না, তাহলে কপালে অনেক বড় দুঃখ আছে। আজ তো আবার তাঁকে ব্যাংক এ যেতে হবে। তার পরে বিশ্ববিদ্যালয়ে। কাল অঘোষিত ছুটি। কালকের কথা ভাবলে এখনি মজা লাগছে কিন্তু আজ তো তার মাশুল গুনতে হবে, আবার বাড়ি না ফেরা অবধি।

প্রতিদিনের মতো ব্যাগ গুছিয়ে বের হলো সে। সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে আরও একবার ব্যাগ খুলে দেখে নিলো সব ঠিক আছে কিনা। মাঝে মাঝেই সে এইটা ওইটা রেখে যায়। রাস্তায় মনে পড়লে আবার ফিরে আসে বাসায়। আজ এমন করা যাবে না। আজ এমনটা করলে অনেক কষ্ট পেতে হবে।

প্রতিদিনের মতো ৫/৭ মিনিট হেঁটে যেতে হবে বাসস্টপে। অনেক দূরে থেকেই বুঝতে পারলো সকালে যা ভেবেছে ঠিক তেমনটাই হতে চলেছে। অনেক অনেক মানুষ বাসের জন্য দাঁড়ায় আছে কিন্তু বাস নাই। যেইগুলা আসছে ওইগুলাতে তিল-ঠাই এর জায়গা নাই। ঢাকাবাসী এই গুলার সাথে অভ্যস্ত হয়ে গেছে। তাদের যে মাঝে মাঝেই এমন পরিস্থির মুখোমুখি হতে হয়।

রাহুল ও আর সবার মতো দাঁড়ায় আছে ১০ মিনিট ধরে। ২/৩ টা বাস আসলো একসাথে কিন্তু সে বাসের অবস্থা দেখে সাহস পেলোনা বাস এর কাছে যাওয়ার। এইভাবে কেটে গেল আরও ২০ মিনিট । বাস ছাড়া আজ অন্য কোন কিছু নাই। কারণ কাল যে নির্বাচন। আরও অনেক ক্ষণ পরে একটা লাল বাস আসলো। আজ এই লাল বাসই শেষ ভরসা। অনেক চিন্তা ভাবনা করে সে বাসে উঠার যুদ্ধে গেল।

কিন্তু সে বার্থ, একটু পরে আবার একটা বাস আসলো। বাস থামা মাত্র মৌমাছির মতো মানুষ গুলা ছুটে গেল সবাই। এইবার সে অনেক মারামারি করে বাসে উঠলো। বাসের ভেতরে আরও অবস্থা খারাপ। পা রাখার মতো কোন জায়গা নাই। কিছু করার নাই, এইভাবেই যেতে হবে। কিছু দূর যাওয়ার পরে একটু ফাঁকা হলো। তবুও বসার মতো কোন জায়গা ফাঁকা নাই। বাসে উঠে পেরেছে এইটা ভেবেই অনেক খুশি। এমন দিনে যারা ভাল ভাবে বাসে উঠেতে পারে, তারাই মনে হয় প্রকৃত ভাগ্যবান। দেড় ঘণ্টা বাসের মাঝে দাড়িয়ে বসে শেষ পর্যন্ত সে পৌঁছাল গন্তবে।

ব্যাংক এ যেয়েও দেখলো আগামী কালকের প্রভাব। এইখানেও বিশাল লাইন। সবাই আগামী ৩ দিনের কাজ আজ সেরে ফেলছে। একটু কষ্ট হলেও আজ করতে হবে। দেওয়ালে পিঠ ঠেকে গেলে আমরা সব কাজ করি। এইটা যেন আমাদের অভ্যাস হয়ে দাঁড়িয়েছে। কাজ শেষ করতে করতে দিনের অর্ধেক চলে গেল।

এর মাঝে তার ২ টা ক্লাস শেষ হয়ে গেছে। ৩ নম্বর টা শুরু হয়েছে ৭ মিনিট আগে। দৌড়াইতে দৌড়াইতে ক্লাস রুমে ঢুকলো রাহুল। ক্লাসের মাডাম এমন করে তাকিয়ে আছে মনে হচ্ছে সে কোন কিছু তার বাসা থেকে চুরি করেছে এবং হাতেনাতে ধরা পরেছে। ৭ মিনিটের দেরির জন্য তাঁকে ৫ মিনিট কৈফিয়ত দিতে হলো। কৈফিয়ত শেষ করে রুমের এক কোণায় শেষের চেয়ারে বসে নিজের হৃদ-স্পন্দন কমানোর চেষ্টা করছে। কোন ভাবে কমছে না তার হৃদ-স্পন্দন। ক্লাসে মনোযোগ দেওয়ার আগেই ক্লাসের সময় শেষ। মনে মনে ভাবতে লাগলো, আজ বাসা থেকে বের হওয়াই উচিত হয়নি। এই ভাবতে ভাবতেই তার মনে হলো আজ সারা দিন কিছু খাওয়া হয়নি। এইটা মনে হবার সাথে সাথেই ক্ষুধা যেন হাজার গুন বেড়ে গেছে।

পরের ক্লাস শুরু হইতে এখনও ২৩ মিনিট বাকি। সব কাজ সেরে ফেলতে হবে তার। ক্যান্টিন এর খাবার ছাড়া আর কোনও ভরসা নাই। যদিও সে ক্যান্টিনের খাবার খুব বিপদে না পড়লে খায় না। আজতো বিপদেরই দিন। সকাল থেকেই তো বিপদ শুরু হয়েছে। এইসব চিন্তা করে ক্যান্টিনে যেয়ে মনে হচ্ছে আগামিকালের নির্বাচনের প্রভাব এইখানেও পড়েছে। রাহুল ভাবতে শুরু করলো, বাহিরের মানুষজন কি আমাদের ক্যান্টিনে এসেছে। তারাও কি আমার মতো সারা দিন না খেয়ে আছে। বাহহিরে যেতে না পেরে এইখানে এসেছে। একটু পরে বুঝতে পারলো, এরাতো সবাই আমাদের মানুষজন। কিন্তু এখন তাঁরা এই খানে কেন? তাঁরা কি জানে না, আমি সকাল থেকে অনেক ঝামেলার মাঝে আছি এবং আমি এখন ক্যান্টিনে আসব। এইগুলা ভেবে নিজে নিজেই হাসছে সে। অনেক কষ্টে কিছু খাবার কিনে বসলো ক্যান্টিনের এক পার্শে। ক্যান্টিনের এই জায়গাটা তার অনেক পছন্দের।

পর পর ৩ টা ক্লাসে কোন কিছু অর্জন করতে না পেরে ক্লাসের প্রথম সারিতে বসেছে। এতো কষ্ট করে আসেছে আর যদি কিছু না শিখে তবে দিনটাই বৃথা। তবে তার আশায় গুরেবালি, ক্লাসে স্যার এসে এক বিরিক্তকর অধ্যায় শুরু করলো। এখন সে আবার অনুশুচনা করতে শুরু করলো। কি দরকার ছিল সামনে বসার আর কি বা দরকার ছিল আজ বিশ্ববিদ্যালয়ে আসার। অনেক কষ্টে ক্লাস শেষ করে বাড়ির পথে পা বাড়াল। সে জানে তার আগামী কিছু ঘন্টা অনেক কষ্টের। অনেক দুর্গম পথ পাড়ি দিতে হবে।

বাস-স্টপে দাড়িয়ে আবার বাসের জন্য তার অপেক্ষা শুরু হলো। কিন্তু কিছু সময়ের মাঝেই সে একটা বাসে উঠে গেল। তার মনে হইতে শুরু হইলো হয়তো শহরটা স্বাভাবিক হয়ে গেছে। অন্য সব দিনের মতো মনে হইতে তার। কিন্তু মিনিট ১০ এর মাঝেই তার ধারনা ভুল হইলো। জ্যাম দেখে তার মনে হইতে শুরু হয়েছে আজ আর বাসায় ফিরা যাবে না। আগামী কাল ভোট দিয়ে বাসায় যেতে হবে। কিন্তু সে তো ঢাকার ভোটার না, এইটা ভেবে অনেক কষ্টের মাঝেও সে একটু হাসল।

ক্লান্ত শরীরটা নিয়ে যেন আর সে পারছে না। সে একটু চোখ বন্ধ করে সারা দিনের ক্লান্তিটা কমানোর জন্য চেষ্টা করছে। চোখ খুলেই দেখে চারিদিকে অন্ধকার, রাহুল ভাবলো এতো তারাতারি সন্ধ্যা হয়ে গেল। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে তার চক্ষু চড়কগাছ। সবে মাত্র ৯ মিনিট পার হয়েছে। বাহিরের দিকে তাকায় তার মাথায় বাজ পরার মতো অবস্থা। কালো মেঘে ছেয়ে গেছে চারিদিকে। কিছু সময়ের মাঝেই হয়তো নেমে আসবে মুসলধারে বৃষ্টি। এমন আবহাওয়া তে তার শরীরের সব ক্লান্তি দূর হয়ে যাচ্ছে। একটা ধমকা হাওয়াতে চারিদিক শীতল করে দিলো। কল্পনার রাজ্যে চলে গেল রাহুল। এইভাবেই কেটে গেল প্রায় ১ ঘণ্টা। এখনও বৃষ্টি শুরু হয়নি। তার নামারও সময় হয়ে গেছে। অনেক কষ্টে মানুষের ভীর ভেঙ্গে বাসের গেটে যেতেই বৃষ্টির বিশাল বিশাল ফোটা পরা শুরু হলো। নিজের কাছে ছাতা আছে, এইটা ভেবে তার নিজেকে ঢাকার সবচেয়ে ভাগ্যবান মনে হচ্ছে।

বাস থেকে নেমে কিছু দূর যেতেই বৃষ্টির ফোটার আকার ছোটো হতে শুরু করেছে কিন্তু পরিমাণ বাড়তে শুরু করেছে। মানুষজন নিজের মাথাটাকে একটু শুকনো রাখার জন্য এইদিক ওইদিক ছুটাছুটি শুরু করে দিয়েছে। তবে রাহুলেও ঐদিকে কোনও নজর নাই। সে বাড়ির পথে চলে যাচ্ছে একমনে, বৃষ্টি জোরে আসার আগেই তাঁকে নীরে ফিরতে হবে। কিন্তু হঠাৎ রাহুলের চোখ আটকে গেলো রাস্তার একপাশে দাড়িয়ে থাকা এক মেয়ের দিকে। মুশলধারে বৃষ্টি নেমে আসছে তবুও তার কোন চিন্তা নাই। একমনে তাকিয়ে আছে বাসের দিকে। কিন্তু কোনো বাসই তার জন্য অপেক্ষা করছে না। প্রকৃতিও চায় না, সে এখন বাসে উঠুক। এই কারণেই হয়তো বৃষ্টির বেগ বেড়ে চলছে। হঠাৎ সেও মাথা লুকানোর জায়গা খুজছে কিন্তু তার আশেপাশে কোনো জায়গা নাই। কিছু দূরে একটা জায়গা দেখতে পেয়ে ঐদিকে যাওয়া শুরু করেছে। তবে তা অনেক দূরে।

রাহুল হাঁটছে আর তার বেপারটা লক্ষ্য করেছে। পাশে যেয়ে ছাতা এগিয়ে দিয়ে বললো ছাতার নিচে আসেন। মেয়েটাও কোনো অমত করলো না, শান্ত মেয়ের মতো ছাতার নিচে চলে আসলো। মিনিট ২ এর রাস্তা পার করে, মেয়েকে বাসস্টপের ছউনিতে রেখে রাহুল আবার নীরের পথে হাটা শুরু করলো।

বৃষ্টি আজ কোনো বাঁধা মানছেনা । চারিদিকের সব ময়লা ধুয়ে-মুছে নিয়ে চলে যাচ্ছে। রাহুলও মাথায় এক খানা কালো ছাতা নিয়ে মুশলধারে পরা বৃষ্টিকে ভেদ করে ছুটে চলছে শান্তির নীরে।